ইভ বোনফোয়া










রুদ্র কিংশুক 

{অনুবাদক}





ইভ বোনফোয়া -র কবিতা প্রসঙ্গে


ইভ বোনফোয়া (Yves Bonnefoy 1923-2016) কবি ও শিল্পসমালোচক। তিনি একজন দক্ষ অনুবাদকও। শেক্সপিয়ারের অনেকগুলো নাটক তিনি ইংরেজি থেকে ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করেছেন। গণিত শাস্ত্র ও দর্শনে বিশেষ উৎপত্তি থাকার কারণে তাঁর কবিতায় বহু বিচিত্র বিষয় এবং বিচিত্র কৌণিকতার সমাবেশ ঘটেছে।


ইভ বনফোয়ার সঙ্গে বাংলা-কবিতা-পাঠকদের পরিচয় বেশ প্রাচীন। পন্ডিচেরি আশ্রমবাসী পন্ডিত-যোগী এবং ফরাসি ভাষায় সুপন্ডিত নলিনীকান্ত গুপ্ত (Nalinikanta Gupta, 1889-1983 ) তাঁর Douve Parle ( দ্যুভ বলছেন )শীর্ষক একটি কবিতা অনুবাদ করেন। বাংলা ভাষায় ফরাসি কবিতার অনুবাদ এবং বাঙালি পাঠকদের সঙ্গে তার পরিচয়নে নলিনীকান্ত গুপ্তের অবদান অগ্রগণ্যের। বুদ্ধদেব বসু ও অরুণ মিত্রকে স্মরণে রেখেই একথা জোরের সঙ্গে উচ্চারিত হওয়া উচিত। ফরাসি কবিদের কিছু কিছু কবিতা অনুবাদ করেই তিনি থামেন নি, তাদের একটি বিশেষ প্রবনতা নিয়েও তিনি গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন। বাংলা ভাষায় অনুবাদ ও শিল্প-সাহিত্য সমালোচনার ইতিহাসে নলিনীকান্ত গুপ্তের অসামান্য অবদান আমারা কেন যে বিস্মৃত হলাম!


ইভ বোনফোয়া কেবল ফরাসি ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি নন, সামগ্রিক ইওরোপীয় কবিতার ইতিহাসে তাঁর নাম শ্রদ্ধার সহিত স্মরিত। উৎকেন্দ্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জোরজবরদস্তি বনফোয়ার কবিতায় নেই। কিন্তু ফরাসি কবিতার আন্দোলগুলির নির্যাসটুকু বনফোয়া আত্মীকৃত করে ফরাসি কবিতায় এক অভিজাত নবীনতা দান করেছেন। মানুষের জীবনের সঙ্গে পারিপার্শ্বিক জগতের যে নিবিড় সম্পর্ক তার তাৎক্ষণিক অনুভবের প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। পাথুরে ভূমি থেকে উৎক্ষিপ্ত নীরবতা---এই রকম এক অতীন্দ্রিয় অনুভবের দিকে বনফোয়ার কবিতার অভিমুখ।


কবিতা ছাড়া শিল্প সমালোচনায় ইভ বনফোয়া বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। মিরো ও গিয়াকোমেত্তির শিল্পকর্ম নিয়ে তাঁর রচনা অভিনবত্বের দাবি করে।









ইভ বোনফোয়া-র কবিতা



১. 

কীসের শব্দ?


কীসের ওই শব্দ?

আমি তো কিছুই শুনিনি...


অবশ্যই শুনেছো তুমি! ওই ঘরঘর। যেন মাটির তলার কুঠুরির ভেতর দিয়ে একটা ট্রেনগাড়ি গর্জন করে চলে গেল।


আমাদের তো কোন ভূগর্ভস্থ কঠুরি নেই।


অথবা দেয়ালের ভেতর দিয়ে ।


কিন্তু দেয়ালগুলো খুবই চওড়া! আর শক্তকরে ঠাসা এতগুলো শতাব্দী ধরে...


ঠিক... ওহো, শোনো!


আমি তো কিছুই শুনছি না...


ওহো, এগিয়ে এসো! একটা কান্নার মতো, না, একসঙ্গে অনেক কান্না।


আমি তোমার কথা বিশ্বাস করি না।


আমাকে বিশ্বাস করতেই হবে তোমায়। ওই! আবার!


আবার কী?

কণ্ঠস্বরগুলো, তিন- চারজন লোক কথা বলছে, ত্রস্ত, হিংস্র।


তাদের সোনার সময় তো তোমার ছিল না।


কিন্তু আমি শুনেছি। হ্যাঁ, খুবই সংক্ষিপ্ত। আবার এটা দীর্ঘ। তাৎক্ষণিক, আমি স্বীকার করি। কিন্তু সীমাহীন। এক টুকরো পাথর, দাগ-সহ, ফাটল-সহ আর সমস্ত রং-সহ---- সেটাই সত্যিকারের অসীমতা, তোমারও কি তাই মনে হয় না? লোকজন যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী একসঙ্গে কথা বলছে। এখানে, এখানে।

এখানে কোথায় ?


ঠিক এখানেই এই ঘরে। ঠিক আমাদের পাশে। দ্যাখো!


আমি তো কিছুই দেখছি না।


তুমি কিছুই দেখছ না! কিন্তু ওই মাথাগুলো! ওই দুজন মানুষ হাত ধরাধরি, না, একজনের একটা হাত অন্যজনের গলায়, আর তারা দুজন আমাদের দিকেই আসছে! তারা আমাদের ভিতর দিয়ে চলে যাচ্ছে!



চারদিকে তাকাও, প্রিয় বন্ধু আমার। টালির উপর পড়ছে সূর্য, ধূলিকণাগুলি দৃষ্টিগ্রাহ্য সূর্যের আলোয় যা তেরছা হয়ে পড়ছে জানালা থেকে, এই ঘরের সুন্দর পরিসর। সংগীত শ্রবণ করো।


হ্যাঁ, আমি শুনছি ক্রমশ জোরে। ফুলছে, ফুলছে, ওহো!


কী এটা?


সেই কান্না এত তীব্র, এত মর্মভেদী! যেন জগত শেষ হতে চলেছে।


বিস্তীর্ণ ও উজ্জ্বল এই গ্রীষ্ম-সকালের আলো । মনোরম, রাস্তা যেটা বেঁকেচুরে গেছে ঝোপঝাড় ও ফুলের ভেতর দিয়ে। দাইম ও রোজমেরি গুল্মের গন্ধ অথবা হতে পারে পুদিনা, সত্যিই আজ খুব তীব্র। পোকামাকড়েরা একে অপরকে খায় ওই চ্যাপ্টা শ্যাওলা-রঙিন পাথরের ওপর।







২. 

হ্যালো? হ্যালো?


হ্যালো? হ্যালো?


আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।


কে আপনি?

লাল, একটা আকাশ যার পুরোটাই লাল।

আপনার কি অন্য কোন নাম আছে?


ঠিক আছে, এই নদী এখানে। ঘাসে, কিছু কিছু কয়লাগুঁড়োর সঙ্গে। ওহো, বেশিরভাগই দলাপাকানো, লোকে তাই বলতো, ছড়ানোছিটানো দলা। জল তাদের সরিয়ে দেয়, এটা সুন্দর। এখানে দৈব্যক্রমে আমি এসে পড়েছি, সমস্ত প্রতিবিম্বনের ভেতর আমি হাত ডোবাই, তুলে আনে কোন একটি দলা। এমন নীল স্রোত কালোর ভেতর দিয়ে বয়ে যায়!


আর ওটাই কি আমার বই?


একটা বই? অন্যসময়, দেখুন, আপনি--- হ্যাঁ, আপনিই--- ছিলেন একটা বন্ধ জাফরি। রাত্রি নামছিল, জাফরির ভেতর দিয়ে আপনি বাগানে কিছুই দেখতে পারছিলেন না কিন্তু আমার বোধ হল একটা প্রাণী--- হতে পারে একটা নেকড়ে? আমার পাশে আসছিল আর যাচ্ছিল । আপনার অনেকগুলো বই আমি পড়েছি।


কে আপনি?


আমি কীভাবে জানব? আপনি কি জানেন কে আপনি? রাতে আপনার আকার একটা গাছের মতো, আকাশের গায়ে, যখন এক ছিলকে চাঁদই কেবল আছে।



আর এখানে এই মানুষ, কে সে?


কোন মানুষ ?


নগ্ন হাটু নিয়ে। মনে হচ্ছে ঘাসে বসে আছে। একজন যে হাসছে। আপনি দেখুন তাকে।



এখানে?


হ্যাঁ, যে এখন শুয়ে আছে, আর পোশাকের বোতাম খুলছে। যে একটা ট্রেনগাড়ির মতো এগিয়ে যাচ্ছে দূরে, অসীম দূরত্বে, অন্ধকারে। আপনি শুনতে পেতেন তার গর্জন ক্রমশ জোড়ালো হচ্ছে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন