কবিদের শ্রেণীবিভাগ 

কবি মানেই একেবারে নিপাট কবি এরকম ভাবলে বিষয়টা নিয়ে এগোনো যাবে না। বৃহত্তম সেন্স এ এটা ঠিক আছে। কিন্ত যদি আতসকাচে দেখা যায় তাহলে বোঝা যাবে কবিদের নানান category আছে। যেমন  conservative, moderate, progressive. কবিতা লেখার সাথে অভিমুখের একটা সম্পর্ক আছে। এক একজন কবি এক এক অভিমুখ নিয়ে থাকেন। মাইকেল মধুসূদন নতুন অভিমুখ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূর্বসূরীদের থেকে আলাদা করতে পেরেছিলেন নিজেকে, আবার নজরুলও  স্বমহিমায় আলাদা। এই আলাদা হওয়ার প্রক্রিয়ার সাথেই কবিদের অভিমুখ নির্মাণ হয়ে যায়। একজন কবি নিজেকে কোন অভিমুখে এবং কবিতা-ক্ষেত্রের কোন অংশে রাখবেন তা কবির একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। এই নিজস্ব ব্যাপারের সাথে কবির নিজস্ব চিন্তাধারা, দক্ষতা , ইচ্ছা, পরিবেশ, সঙ্গ, শিক্ষা এসব জড়িয়ে থাকে। এই ব্যাপারে কোনো জোর জবস্তি নেই। এটা কবির ভিতর থেকে উঠে আসা একধরনের urge যা একজন কবিকে নিবিষ্ট রাখে তাঁর ক্ষেত্রের মধ্যে। কবিও চান না তাঁর  safe zone থেকে নিজেকে বের করতে কারণ এই writing zone এ তিনি খুশি এবং আনন্দিত। মূলত কবির এইরূপ মানসিকতা এবং দক্ষতার উপর নির্ভর করে উল্লেখ্য তিন ধরনের বিন্যাস। Conservative  বা রক্ষণশীল কবিরা প্রথাগত যা চলে আসছে সেই ঘরানায় লিখতে অভ্যস্ত, যেমন মাত্রাভিত্তিক ছন্দের কবিতা। কিন্ত ছন্দ ভাঙা বা restructure এর প্রচেষ্টা নয়। তৎসম শব্দের বেশি প্রয়োগ করার উৎসাহ এবং কবিতা লেখার মধ্যে নিজের একটি ভাবগম্ভীর ( কিছুটা উদাসীন ) ইমেজ বজায় রাখতে চান। এঁদের কাছে কবিতা হল সেই মাধ্যম যা বিশুদ্ধ ঘরানার কথা বলে, নান্দনিক সবটাই। এঁরা অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখতে ভালোবাসেন এবং আত্মতুষ্টির আচ্ছন্নতায় সুধাময় থাকেন। কবিতার ভিন্ন ঘরানার কথা বললে এঁরা ক্ষুব্ধ হন এবং মনে মনে সন্দেহ পোষণ করেন অপরজনকে। নিজেদেরকে সংরক্ষিত করে রাখেন তথাকথিত বিশুদ্ধ ঘরানায় যেখানে উন্মুক্ত পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা কম। এঁরা নিজেদের সংঘবদ্ধ করে রাখেন সংরক্ষণ পন্থীদের সাথে। এঁরা স্থানীয়-কেন্দ্রিক হয় এবং থাকতে ভালোবাসেন। স্থানীয়  বিভিন্ন কবিতা পাঠের আসরে এঁরা থাকেন। এঁরা মাস্টারমশাইসুলভ, এঁদের চোখে কিঞ্চিত আত্মশ্লাঘা, তবে এঁরা অমাইক হন। রক্ষণশীল এই কবিরা কবিতার ভাঙাগড়া, ব্যপ্তি , তত্ত্ব এইসব নিয়ে ভাবিত নন। স্থানীয় পত্রিকার সাথে এঁরা জড়িয়ে থাকে, কখনও কখনও আরো কিছু সংরক্ষণ-পন্থী পত্রিকায়। অধিক competition এর জায়গায় যেতে পছন্দ করেন না এঁরা। এঁদের মধ্যে সম্ভাবনা থাকলেও, হয়তো জানকারির অভাব বা মেধার অভাব বা মেধার প্রয়োগের অভাবে গন্ডীবদ্ধ থেকেই যান থেকেই যান। এই থেকে যাওয়ার মধ্যে আপাতত কোনো ভুল নেই কারণ প্রত্যেকেই তাঁদের হিসেব মতো চলতে ভালোবাসেন এবং ক্ষমতাও একটা বড়ো factor. ভিতরে আগুন জ্বললে, সে আগুন তো বাইরে আসবেই। এখন বিচার্য হল আগুনের বহিঃপ্রকাশ কতটা তীব্র।  কম আগুনের জন্য কম বহিঃপ্রকাশ।  



Moderate কবি: 
আসুন এবার moderate বা মধ্যপন্থী কবিদের নিয়ে দু চার কথা। এই শ্রেণীর কবিরা মূলত প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকে বা থাকতে ভালোবাসে। এঁদের লেখার ভাষা মাঝামাঝি গোত্রের। অবশ্যই এঁরা ভালো কবিতা লেখেন। কিন্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার মানসিকতার জন্য এঁরা নিজেদের খোলস ভাঙার কথা ভাবলেও কাজে দেখাতে পারেন না। এঁরা নিজেদের সৃষ্টি জনতার দরবারে ছেড়ে দেন এবং পাঠক-ই এঁদের মূল লক্ষ্য। পাঠক সন্তুষ্টির দিকে তাকিয়ে এঁরা রচনা করেন চলতি ধারার বা বাজার-মুখী। প্রাতিষ্ঠানিক কাগজে লেখা ছাপানোর এবং খ্যাতি অর্জনের জন্য এঁদের দৌড়ঝাঁপ করতে হয়। এঁরা বিভিন্ন সময়ে কবিতা উৎসব করেন নানান নামে, সেই নাম আন্তর্জাতিক বা বিশ্ব নিরিখেও হয়ে ওঠে। বিভিন্ন কবিতা পাঠের আসরে এঁরা কবিতা পাঠ করেন এবং ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চেনা মুখগুলোকেই দেখা যায়। সেই সব উৎসবে মঞ্চ আলোকিত করেন প্রাতিষ্ঠানিক কর্তারা। ফলে একটা satisfaction ভোগ করতে থাকেন। এঁরা কবিতার নামকরণ করেন কখনও আবহমান ধারা বলে, আবার কখনও চিরাচরিত ধারা বলে। নতুন কিছু সংযোজন বা আত্তীকরণ করার ক্ষেত্রে এঁদের গড়িমসি ভাব প্রবল, নতুন ধারার লিখতে মন চাইলেও বেশিরভাগ সময় তা পেরে উঠতে পারেন না। ফলে নিজেদের মধ্যে গ্রুপ তৈরি করে কবিতা পাঠের আসর করেন। এঁরা সেই সব পত্রিকাতে লেখেন যে সব পত্রিকা প্রতিষ্ঠানের গুণগ্রাহী। এঁদের কবিতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেশ ধোঁয়াশা গোছের, ভাষাগত জটিলতা প্রবল, ভাবের জটিলতা থেকেও, ফলে এঁদের কবিতার বক্তব্য অত্যন্ত অস্পষ্ট।  অনেক সময় মাখো মাখো কবিতা লেখেন। কিছুটা শিক্ষকসুলভ স্বভাব, কিছুটা আঁতলামো এবং বেশ কাব্যিক বাতাবরণ তৈরি করে রাখেন নিজের মধ্যে। এঁরা বেশি পরিচিত হন এবং খ্যাতিও অর্জন করেন। এঁদের মুখে কখনোই শোনা যাবে না যে কবিতার বদল করা যেতে পারে এবং তা সম্ভব। এঁরা ভাবেন কবিতার বদল সময়ের হাতে এবং কীভাবে সময় তা বদল করিয়ে নেয়, সে সম্পর্কে ধারণা কেবলমাত্র সময়ের হাতেই ছেড়ে দেন। এঁরা ভাবতে থাকেন সব বদল automatic হয়। কাজেই কবিতা লিখে যাওয়া-ই কেবল কাজ, কবিতা সম্পর্কে নতুন কিছু করা বা ভাবনা নৈব নৈব চ। কবিতা এবং কবির বাজার এঁদের দখলেই। কবিতা পাঠের আসরে প্রবল ভাবে উপস্থিত থাকার লড়াইয়ে, অত্যন্ত বিচক্ষণ।  প্রচলিত ভাবনা এবং সিলেবাস নিয়ে আরাম অনুভব করার কিছুটা দায়িত্বও থাকে মনের ভিতর। ক্লাসিক্যাল ঘরানার, ঐতিহ্যে ডুব দেওয়ার সুধাপানকারী, সুখ নির্মাণ করেন এঁরা। 




বিষয় প্রগ্রেসিভ কবি :
প্রবল ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়েও যে ভেঙে পড়ছে না, প্রকৃত ভালোর পথে থেকেও যে বারবার প্রতারিত হচ্ছে, উপেক্ষিত হচ্ছে, যার আশা-বাস্তব ক্ষীণ হতে হতে হারিয়ে যাচ্ছে বাতাসে, তার মতো আরও অনেক আছে যাদের অস্তিত্বের অর্থ নিরুপায়ের সামিল তারাই বুঝি প্রকৃতপক্ষে উঠে দাঁড়ানোর গল্প বলে। অধিকাংশ মানুষ যখন চলে যায় স্রোতের পথ ধরে, একাকিত্বের স্বাদ নিয়ে তখন কেউ কেউ ভিন্ন ধারায় হাঁটতে চায় কেন। যে পথে গভীর শ্রম, ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তা লুকিয়ে, তার মধ্যে এমন কী আনন্দ গাঁথা থাকে, মানুষগুলো এমনতর হয়। কী আনন্দের হাতছানিতে বিপদসংকুল হয়েও, আইসোলেটেড হয়েও সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। এ কি শূন্যতার ঝুলিতে নতুন করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা। হয়তো তাই। না হলে চোখের জল মুছেও, হাতের মুঠি শক্ত করে পুনরায় দৌড় শুরু করে। দৌড় ঠিক নয়, তাদের পথ পরিক্রমার কনটিনিউটি করা। এই দলেরই বুঝি থাকে progressive মানসিকতার ঝাঁঝ। তাঁরা চায় তাদের নতুনত্বের সৌজন্যে কাঁটার পথ বেছে নিতে। হয়তো সফলতা আসতেও পারে , তবে না আসার সম্ভাবনা নিয়েই তো বয়ে যেতে থাকে। প্রগ্রেসিভ মানসিকতার কবিদের সংখ্যা খুব কম হলেও এক্কেবারে নেই তা নয়। তারা আলোচিত না হয়েও আলোকিত। তাদের সভা সমিতিতে খুব কম দেখা যায়, আমন্ত্রণের তালিকায় নাম কদাচিৎ থাকে। বস্তুত তাদের লেখার ধরণ এবং প্রকৃতির জন্য বেশিরভাগই মেনে নিতে পারে না, ফলে উপেক্ষিত হতে থাকে। ওদের লেখা এতটাই স্বতন্ত্র এবং ভিন্নতর যে একশো দুশোর মধ্যে রাখলেও আলাদা হয়ে যায়। এদেরকে বেশিরভাগ কবিই অপাংক্তেয় মনে করেন। আদপে তা কিন্ত নয়। সমালোচক এবং শত্রুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার জন্য progressive কবিরা নিজেদের লেখার মধ্যে নিমজ্জিত রাখতে ভালোবাসেন। তবু কোথাও অযাচিত দরবার করতে চান না, ইগো সমস্যার জন্য, শিরদাঁড়া শক্ত হওয়ার অবস্থানের জন্য। ভবিষ্যতের কবিতার দিক নির্দেশ কি এঁদের হাতেই হতে থাকে খুব সন্তর্পণে, বৃক্ষের মতোই কি এঁরা দাঁড়িয়ে থাকে সময়ের ক্ষয় রোধ করে। হয়তো এত সব মাথায় থাকে না এই সব কবিদের। নিছক সৃষ্টির আনন্দে মেতে থাকতেই পছন্দ। কী এসে যায় অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যের দ্বারা মূল্যায়িত হতে। বর্তমান তো তাদের সব সময় মূল্যায়ন করতে পারে না। যদি বলা হয় এ একধরনের সান্ত্বনা মনকে আশ্বস্ত করার জন্য, নিজের কাছে নিজেকে শক্তি পাওয়ার জন্য। তা হতে পারে। কিন্ত এই যে লড়াকু মনোভাব, নিজেকে বয়ে নিয়ে চলার সংগ্রাম এটাকে যদি স্যালুট না জানানো হয়, তবে কোন বিনিয়োগের কাছে আপনি হার মেনে থাকবেন। জিরো বাউন্ডারি মতে কেউ শেষ হয় না, কারণ এখানে যোগ্যতমের উদ্বর্তন নেই, আছে সব কিছুকে ধরে রাখার প্রয়াস। অর্থাৎ বর্তমান  অগ্রাহ্য করছে মানে, সময় তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে তা এক্কেবারেই নয়। প্রবল এক শক্তি নিয়ে এঁরাই দাঁড়িয়ে থাকবে। সময় কি মিথ্যা করে দিতে পারে একদম। 





আফজল আলি 


Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন