রুদ্র কিংশুক--এর প্রবন্ধ




চার্লস বার্নস্টাইন ও তাঁর নতুন কবিতার কর্মশালা



চার্লস বার্নস্টাইন অ্যামেরিকার পোস্টমডার্ন কবিতায় একটি বিশিষ্ট নাম। এই বিশিষ্টতা তিনি অর্জন করেছেন তাঁর নিরীক্ষামূলক কবিতা ও অ্যামেরিকার পোস্টমডার্ন পোয়েট্রি ওয়ার্কশপ পরিচালনার সুবাদে। পোস্টমডার্ন কবিতা সৃষ্টি ও তার উপযুক্ত পাঠক তৈরি—এই দুটোকেই বার্নস্টাইন তাঁর সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছেন। ওয়ার্কশপ থেকে তাঁর কবিতা উঠে আসে, তাঁর কবিতায় ওয়ার্কশপের আঁচ লেগে থাকে যা নতুন কবিতার উদ্দীপক হিসাবে কাজ করে। এই কারণে আমেরিকার তরুণ কবিতা-চর্চাকারীদের কাছে চার্লস বার্নস্টাইনের বিশেষ গুরুত্ব অর্জন।

বার্নস্টাইনের জন্ম ১৯৫০-এ, নিউইয়র্ক শহরে এবং পড়াশোনা হার্ভার্ড কলেজে। এ পর্যন্ত তাঁর কবিতা সংকলন ও কবিতা- বিষয়ক গ্রন্থের সংখ্যা কুড়ির অধিক। এর মধ্যে ‘পারসিং’ (Parsing, 1976), 'লিজেন্ড' (Legend, 1980), 'স্টিগমা' (Stigma, 1981), 'দ্য ন্যুড ফরম্যালি' (The Nude Formalism, 1981) ‘রাফ ট্রেন্ডস্' (Rough Trades 1991) ‘ডার্ক সিটি’ (Dark City, 1994) – এই কাব্যগ্রন্থগুলি উল্লেখযোগ্য। আমেরিকার নতুন কাব্যভাবনার ফসল এইসব গ্রন্থের কবিতাগুলি। অথবা বলা যায়, এই কবিতাগুলিকে কেন্দ্র করেই আমেরিকার নতুন কাব্যধারণা বা নিউ পোয়েটিক্স (New Poetics) স্পষ্টতা ও মান্যতা পেয়েছে। ‘মাই ওয়ে: স্পিচেস্ অ্যান্ড পোয়েমস্' (My Way Speeches and Poems, 1999) ও ‘আ পোয়েটিক্স’ (A Poetics 1992) তাঁর গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের বই যা বার্নস্টাইনের কবিতায় প্রবেশের অনেকগুলি দরজার হদিশ দেয়। অনেকগুলি কবিতা সংকলন সম্পাদনা করেছেন বার্নস্টাইন। ব্রুস অ্যানড্রজের সঙ্গে সম্পাদিত আমেরিকার ভাষা কবিতা বা ল্যাংগুয়েজ পোয়েট্রির সংকলন 'ল্যা=ং-ও-এ=জ বুক (The L=A=N=G=U=A=G=E Book, 1984) খুব উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ভাষাকবিতার মুখপত্র ( L=A=N=G=U=A=G=E) প্রকাশনা ও সম্পাদনাতেও বার্নস্টাইনের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। বর্তমানে তিনি 'দ্য ইলেকট্রনিক পোয়েট্রি সেন্টার' (The Electronic Poetry Center) এর কার্যকরী সম্পাদক এবং পেনিসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক। গুগেনহেইম ফাউন্ডেশন্ অ্যাওয়ার্ড ছাড়াও তিনি অনেকগুলি পুরস্কার ও ফেলোশিপ্ পেয়েছেন।

‘দ্য নিউইয়র্কর’ (The New Yorker) 'আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউ' '(American
Poetry Review) পত্রিকার মতো বাণিজ্যিক কাগজে প্রকাশিত কবিতাকে বার্নস্টাইন অফিসিয়াল ভার্স কালচার' (Official Verse Culture) বা প্রতিষ্ঠানিক কবিতা চর্চা বলে মনে করেন। এইসব লেখার মধ্যে বার্নস্টাইন খুঁজে পান এক ধরনের শস্তা ফ্যাশান যা মানুষের মনের আসল পরিচয়কে কখনই তুলে ধরে না। মিডিয়ার প্রচার এবং অ্যাকাডেমিক রিকগনিশান (Academic Recognition) পাবার জন্য এইসব কবিতার লেখকেরা কবিতার ভাষা ও বিষয় নিয়ে কোন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে যেতে চান না, অনুভবের কোন নতুন আবিষ্কারকেও তাঁরা কবিতায় আনতে ভয় পান। তাই এঁদের কবিতা নতুন জীবন ও নতুন জগৎ, নতুন অনুভবের প্রকাশ হয়ে উঠতে পারে না। বার্নস্টাইন তাঁর একটি দীর্ঘ কবিতা-প্রবন্ধ বা প্রবন্ধ-কবিতা (essay poem)-য় লিখছেন :

Moreover, official verse culture of the last 25 years has engaged in militant... campaigns to "retrict the subversive, independent of things, nature of the language" in the name of the common voice, clarity, sincesity or directness of the poem, & specifically in the highly problematic equating, as in the passage from Westing, of the "irrational" and the "artificial".

পশ্চিমী কবিতার ভাষা বার্নস্টাইনের কাছে খুব কৃত্রিম বলে মনে হয়েছে। ভাষাকে ভেঙে ভেঙে ভাষার ভেতরের বাঙ্ময় নৈঃশব্দ্যকেই বার্নস্টাইন ধরতে চেয়েছেন। ভাষা মধ্যস্থ ধ্বনির গৌরবকে তিনি বুঝতে চেয়েছেন তাঁর কবিতায় ও মননে। পশ্চিমী জ্ঞানচর্চার মধ্যে রয়েছে 'লোগোসেন্টিসিজজ্ম' (logo-cetricism) বা 'ভাষা-কেন্দ্রিকতা যা ভাষা মধ্যস্থ অর্থের চেয়ে বাইরে থেকে আরোপিত অর্থকে বেশি গুরুত্ব দেয়। জাক দেরিদা পশ্চিমী জ্ঞান চর্চার এই প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছেন। বার্নস্টাইন এই প্রবণতা থেকে কবিতার ভাষাকে বার করতে চেয়েছেন। অর্থঝোককে ধ্বনির প্রাধান্য দিয়ে তিনি প্রতিস্থাপিত করতে চেয়েছেন। ভারতীয় ‘হ্রীং’ মন্ত্রে ব্যবহৃত হয়েছে ধ্বনি যা প্রকৃতির ধ্বনিজগৎ থেকে গৃহীত। এই মন্ত্রে ধ্বনিকে আশ্রয় করে ‘অর্থময়তা’র পরিসরে পৌঁছানোর ইঙ্গিত আছে। ধ্বনি এখানে যোগ-সরণি যা বৃহৎ ও ক্ষুদ্রের মধ্যে মিলনের সম্ভাবনা তৈরী করে অথবা ক্ষুদ্রের মধ্যে থাকা বৃহৎকে জাগিয়ে তোলে। ধ্বনির এই মহাত্মাকেই খুঁজে চলেছে, জেনে বা না জেনে বিভিন্ন ভাষার নতুন কবিতার লেখকেরা। বার্নস্টাইনের পোষ্টমর্ডান আমেরিকান পোয়েট্রি : আ রিডিং ওয়ার্কশপ (Postmodern American Poetry A Reading Workshop)-এ ভর্তির জন্য প্রয়োনীয় যোগ্যতার তালিকায় ধ্বনি সম্পর্কিত এই ইঙ্গিত দেওয়া আছে। তালিকাটি এইরকম ১. যিনি ভর্তি হতে চান এই ওয়ার্কসপে তাঁর কবি হওয়া চলবে না। কবির একটা

বিশেষ অনুভবের জগৎ আছে। যার বাইরে তিনি যেতে চান না। ২. কবিতা পড়ার অভিজ্ঞতা থাকা অবাঞ্ছনীয়। থাকলে পাঠের এই নতুন আঙ্গিক তিনি গ্রহণ করতে পারবেন না।

৩. অবিশ্বাস্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে তাঁকে। ৪. নতুন নতুন চিন্তা করার ক্ষমতা থাকা চাই।

৫. কবিতার ধ্বনি শুনে তার অর্থ খুঁজতে হবে।  ব্যবহৃত শব্দের আভিধানিক অর্থে নয় বা প্রচলিত অর্থে নয়।

ভাষাকে বার্নস্টাইন কখনও কখনও বাধাস্বরূপ মনে করছেন, কারণ পশ্চিম জ্ঞানের কেন্দ্রিকতা বা লেগোসেন্ট্রিসিজজ্ম তার খোলা পরিসরগুলিকে বন্ধ করে দিয়েছে। ভাষার ধ্বনিময়তা, বাঙ্ময়তা, অসীম ইঙ্গিতময়তার পরিসরগুলিকে পুনরাবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন তাঁর লিখন ও পঠন কর্মশালার পাঠক্রমের ভেতর দিয়ে।

প্রাচীন ভারতীয় কবি, দর্শনিক ও চিন্তাবিদদের ভাষার এই ধ্বনিময় পরিসর জানা ছিল। ভর্তৃহরি তাঁর সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ ‘ব্যাকরণপাদিকা’য় ধ্বনি থেকে অর্থময়তায় যাওয়াকে ‘স্ফোট’ তত্ত্বের মধ্যে দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন। ভর্তৃহরির মতে কোন শব্দের অর্থ বাইরে থেকে আরোপিত নয়, শব্দ মধ্যস্থিত ধ্বনি ও  ইঙ্গিত ইশারার সমন্বয়ই শব্দটির অর্থ পরিস্ফুট করে। ভর্তৃহরির সঙ্গে দেরিদার এখানেই গভীর মিল।

বার্নস্টাইন ও তাঁর নতুন কবিতার কর্মশালাকে ঘিরে আমেরিকায় পোষ্টমডার্ন কবিতার একটা চর্চাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বাংলা ভাষায় এরকম কোন বিশেষ ব্যক্তি নয়, অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিনকে ঘিরে অসংখ্য চর্চাকেন্দ্র গড়ে উঠছে। পশ্চিম বাংলার প্রান্তে প্রান্তে তরুণ কবিরা লিখছেন বিপুল বৈচিত্র্যের বিপুল সংখ্যক কবিতা যাকে উত্তর-আধুনিক, পোস্টমডার্ন, অধুনান্তিক, ভাষান্তিক, উত্তর-ভাষিক, নারীবাদী, প্রকৃতিমুখীন, লোক-অধুনান্তিক, খোলামুখ—যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন তাদের নতুনত্ব সম্পর্কে সন্দেহাতীত হওয়া যায়। এই নতুন কবিতাগুলিতে কখনও দেখা যায় আঙ্গিক বদলের প্রচেষ্টা, কখনও আত্মিক দর্শনের বদল বা দেখন ভঙ্গিমার বদল। কখনও এই দুই বদলের সমন্বয়েই তৈরি হয় নতুন কবিতা। নতুন আঙ্গিকে পুরোনো কবিতা, পুরোনো আঙ্গিকে নতুন কবিতা এবং নতুন আঙ্গিকে নতুন কবিতা—এই তিন রকমের কবিতাই দেখা যাচ্ছে বাংলা নতুন কবিতা চর্চার পরিসরে বা পরিমণ্ডলে। এই সবের মধ্যে দিয়েই তৈরি হবে ঐতিহ্য সম্পৃক্ত ভবিষ্যতের কবিতা, যেখানে প্রাচীন দর্শন ও নতুন পদার্থবিদ্যা মিলে গিয়ে তৈরি করবে এমন পরিসর যেখানে ধ্বনির মধ্যে আননান্তিক ও অনেকান্তিক অর্থময়তা বেজে উঠবে অভেদজ্ঞান ও অভেদবোধের আস্পৃহায়। শব্দ থেকে নৈঃশব্দ্যের দিকে যাওয়া এবং নৈঃশব্দ্যের মধ্যে বাঙ্ময়তাকে আবিষ্কারই নতুন কবিতা অভীপ্সা। নতুন চিন্তাচেতনার এই পরিসরে পৌঁছাতে এই সময়ের কবিরা  কখনো ব্যবহার করছেন ট্যারোকার্ডের ইশারা, কখনো তন্ত্রের দেহতত্ত্ব,কখনো স্বপ্ন বিজ্ঞান। অন্বেষণ এর নানান চিহ্নগুলি সঞ্জিত  পৃথিবীর সব ভাষার নতুন কবিতায়। শুধু দর্শনের জগতের নয়, বিজ্ঞানের রসদভান্ডারও ব্যবহৃত হচ্ছে নতুন চিন্তাচেতনার কবিতায়। ব্যবহৃত হচ্ছে তাই নতুন চিন্তাচেতনার কবিতায়। আধুনিকতা প্রকৃতি বর্জনের দিশায় পেতে চেয়েছিল সভ্যতার অভিমুখ। জীবনের সাম্প্রতিক  অভীপ্সার ভেতরে আবার প্রকৃতিমূলীনতার দিশা ফুটে উঠছে। নতুন কবিতার ভাবরাজ্যে তাই আবার প্রকৃতির আরোধনা, প্রকৃতির ভান্ডার ছুঁয়েছেনে আবার শব্দনির্মাণ। প্রকৃতি কথা বলে তো ধ্বনি ও সংগীতে, রং ও নৈঃশব্দ্যে। নতুন চিন্তাচেতনার কবিতা তাই ধ্বনিচিত্র ও ধ্বনিকল্প নির্মাণে যত্নশীল। এইসব বহু নিরীক্ষার মূলে রয়েছে মানবচিন্তনের ভেতরে অভেদ-জ্ঞানের সাধনা। আধুনিকতার সংজ্ঞায়িত, সীমিত পরিসর থেকে কল্পনার অনন্তে মানববোধ অগ্রসর হতে চায়। নতুন কবিতায় তারই চরণচিহ্ন আঁকা। বাংলা ভাষার তরুণ কবিদের কবিতায় এই অভেদের দিকে যাত্রার অভিমুখ সহজেই লক্ষণীয়। ভেদের দুটি চরিত্র। আধুনিকতা-পালিত ভেদের বোধ ও সাম্রাজ্যবাদী বাচনে প্রচারিত ভেদজ্ঞান। একটি এদেশের মানুষের চেতনে লালিত, অন্যটি তার চেতনার গভীরে কৌশলে প্রতিষ্ঠিত বা বপন-করা। এই সময় ও পরিসরের কবিতা এই উভয় 'ভেদ' থেকে যাত্রা শুরু করে এক সামগ্রিক অভেদ চৈতন্যে উত্তীর্ণ হতে চায়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন